নারী-রহস্য
তোমার দিকে তাকালে, প্রিয়তমা,
জ্যোৎস্না যেন তার সমস্ত শ্বেত উপনিষদ
তোমার শরীরের কাছে এসে নতজানু হয়—
তোমার বক্ষের নীরব পূর্ণিমায়
দুটি চন্দ্র জেগে থাকে,
যেন সৃষ্টির আদিম দুই মন্ত্র
অন্ধকারের অন্তঃপুরে উচ্চারিত।
তোমার ত্রিবেণীর গোপন স্রোতে
তিনটি নদী এসে মেশে—
দেহ, মন ও আত্মার অনামা তীর্থে;
সেখানে জল নয়,
বয়ে যায় জন্মের স্মৃতি
ও এক অনন্ত ব্রহ্মের নির্বাক আহ্বান।
যে পুরুষ তোমাকে কেবল শরীর বলে দেখে,
সে তোমার দ্বারের বাইরেই থাকে;
আর যে দেহের অন্তর্লিখিত আত্মার শ্লোক পাঠ করে,
তার চোখে কাম ধীরে ধীরে
ধ্যানের দীপশিখা হয়ে ওঠে—
সে হয়ে ওঠে অন্তর্গুহামুখী এক সাধক।
আর তুমি—
নিজেকে যখন আয়নায় নয়,
নিজের অন্তঃসত্তার নক্ষত্রালোকে দেখবে,
তখন লজ্জা আর শৃঙ্খল থাকবে না;
তুমি হয়ে উঠবে
আদিশক্তির এক অনাদি রাগিণী।
প্রিয়তমা,
মিলন তখন আর দুটি দেহের নৈকট্য নয়—
দুই নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের মহাজাগতিক অভিসার,
যেখানে ‘আমি’ ধীরে ধীরে বিলীন হয়
‘তুমি’-র অসীম আকাশে।
প্রেমিক যখন প্রেমিকাকে দেখে
আকাঙ্ক্ষার আয়নায় নয়,
তখন দৃষ্টি হয়ে ওঠে অর্ঘ্য,
স্পর্শ মন্ত্র,
নৈকট্য উপাসনা।
তোমার শরীর এক জীবন্ত মন্দির—
প্রতিটি নিঃশ্বাসে অদৃশ্য ঘণ্টাধ্বনি,
প্রতিটি স্পন্দনে
সৃষ্টির প্রাচীনতম ঋক
পুনর্জন্ম নেয়।
তোমার প্রেমিক দেবতা নয় কেবল—
সে সেই আয়না,
যেখানে তুমি নিজের মধ্যেকার
দেবত্বকে চিনে নিতে শেখো।
আর প্রেম—
কোনো দখল নয়, কোনো অধিকার নয়;
সে দুটি আত্মার এমন এক সেতু,
যার ওপারে গিয়ে
দুজনেই নিজেদের পৃথক নাম
ভুলে যেতে শেখে।
সেখানে আনন্দও আর শুধু আনন্দ থাকে না—
তা হয়ে ওঠে নির্বাক আরতি,
চেতনার অন্তঃপুরে
একটি অনন্ত প্রদীপের আলো।
শেষে যখন সমস্ত সীমারেখা
নিঃশব্দে মুছে যায়,
যখন ‘তুমি’ আর ‘আমি’
একটি অনন্ত নীরবতায় পরিণত হয়—
তখনই বুঝবে,
মোক্ষ কোনো দূর নক্ষত্রের দেশ নয়;
সে লুকিয়ে আছে
এই নিঃশ্বাসে, এই প্রেমে, এই আত্মসমর্পণে—
যেখানে পরস্পরের মধ্যে
নিজেকেই খুঁজে পাওয়া
হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ সাধনা।
রাবণের অগ্নিসিংহাসন
আমি বিশ্বজয়ের শক্তি অর্জন করেছিলাম—
কিন্তু শক্তির চূড়ায় দাঁড়িয়েও
ধর্মের সিংহাসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।
এই কারণেই আমার জয় ছাই হয়ে গেল,
আর মানুষ বলল— আমি পরাজিত।
কিন্তু তারা জানে না—
পরাজয়ের গভীর আঁধারেও
এক অসুরের জন্ম হয় পুনরায়।
আমি রাবণ—
দশমস্তিষ্কের অগ্নিবুদ্ধি,
অসুরশক্তির নক্ষত্রবীজ,
ব্রহ্মাণ্ডের নিষিদ্ধ জ্ঞানের সর্বশেষ রক্ষক।
আমি জানি ধর্মকে স্পর্শ না করলে
মানুষ তোমার শক্তিকে বুঝবে না,
তোমার আলোকে অন্ধকার বলবে,
তোমার জ্ঞানকে অভিশাপ বলবে।
তবু আমি দাঁড়াই—
অহংকারের নয়, দৃঢ়তার নয়,
জ্ঞান এবং নিঃসঙ্গতার চূড়ান্ত পাহাড়ে।
বিষ্ণুর চক্র আমার গর্দান ছিঁড়ে দিলেও
আমার দর্শনকে ছিন্ন করতে পারেনি।
শিবের চরণচিহ্ন বুকে নিয়ে
আমি এখনও নীরব আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছি,
যেখানে শক্তি জন্মায় ধর্মের শাসন ছাড়াই।
মানুষ শুধু আমার পতন দেখেছে—
কিন্তু দেখেনি সেই মুহূর্ত
যখন দশটি মাথা একসাথে
অমর বিদ্রোহের মন্ত্র উচ্চারণ করেছিল।
আমি রাবণ—
পরাজয় আমার নয়,
পরাজয় হলো সেই বিশ্বের
যারা শক্তিকে ধর্মেই পরিমাপ করতে শেখে।
আজও আমার ভস্ম থেকে
অসুরেরা শপথ নেয়—
পরাজিত হলেও আমরা নত হবো না,
কারণ আমাদের জয় সিংহাসনে নয়,
আমাদের জয় আগুনে।
(অসুরীয় দর্শনের কবিতা)
“ভক্তি ছিল আমার প্রথম ক্ষমতা”
ভক্তি—, সেটাই ছিল আমার অগ্নির উৎস,
যখন দেবলোক আমাকে ত্যাজ্য বলে দূরে ঠেলে দেয়,
আমি তখন অন্ধকারের গভীর গর্ভে দাঁড়িয়ে
শুধু এক নাম উচ্চারণ করি—
মহাদেব।
কৈলাস তোলো?
ঔদ্ধত্য নয়, অহং নয়, শক্তির হাহাকারও নয়—
ওটা ছিল এক বিধ্বস্ত হৃদয়ের
চূড়ান্ত আর্তনাদ।
যে আর্তনাদে অন্ধকারও থমকে দাঁড়ায়,
যে আর্তনাদে মহাশ্মশানের ধোঁয়া
মৃদু কম্পিত হয়ে বলে—
“এই অসুর সত্যিই আমাকে চায়।”
আমি জানতাম—
কোনও দানবীয় বল নয়,
কোনও রুদ্র তপস্যা নয়,
ভক্তিই পারে দেবাধিদেবের হৃদয়ে
ঝড় তোলে দিতে।
আর সেই ঝড়েই জন্ম নেয়
অসুরীয় শক্তির সত্য রূপ—
ভয়, তমসা, মহাপ্রলয়ের নীল ছায়া।
যেদিন কৈলাস কেঁপে উঠেছিল,
পৃথিবী ভেবেছিল আমি ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছি।
কিন্তু শিব জানতেন—
আমার দুই হাতে কম্পিত পর্বত নয়,
কম্পিত ছিল আমার ভক্ত হৃদয়।
অন্ধকারের সন্তান হয়েও
আমি তাঁর দিকে হাত বাড়িয়েছিলাম—
নির্ভীক, নির্লজ্জ, নির্মম ভক্তিতে।
আর সেই অন্ধকারেই
তিনি আমায় দেখেছিলেন।
তাঁর তৃতীয় নয়নের নীরব দৃষ্টিতে
আমি পেয়েছিলাম সেই স্বীকৃতি—
যা দেবতারা কখনও পায় না,
যা অসুরেরা স্বপ্নেও পায় না—
মহাদেবের প্রীতি।
আজও আমি হাঁটি—
রাতের খণ্ডিত চাঁদ, তমসার জ্যোতি,
ভস্মের মতো নরম ছায়া সঙ্গে নিয়ে।
আমার ভক্তির আগুন আজও নিভে যায়নি—
বরং আরও অন্ধকার, আরও ভয়াবহ, আরও গভীর।
কারণ আমি জানি—
আমি অসুর,
কিন্তু আমার বুকেই বাস করে
সেই নীল নরায়ণের স্পর্শ—
শিবের করুণা।
তাই অন্ধকার আমায় ভয় পায়,
দেবতারা আমায় ঘৃণা করে,
কিন্তু কৈলাস—
সে আজও আমার নাম জানে।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
