জলধি / কবিতা / তুলি রহমানের পাঁচটি কবিতা
Share:
তুলি রহমানের পাঁচটি কবিতা

পোড়াদহকাল


মন যেন এক স্টেশন
বাঁকে বাঁকে এক সহস্র আলোর ঘূর্ণন
আলোহীন এক কায়া, দূরতম বৃত্তের দিকে 
ছুটে যায় হরিণের চিৎকারে
হরিণ যেনবা এক মায়াশিকমা গল্প।

এক অযুত আলোর ঘূর্ণি পেরিয়ে
তুমি এলে ধীরপায়ে মৃদু হেসে
এই দিকহীন আলোর - কতযে ছল ও ছলনা
সেসব লুখিয়ে রেখে খোপার মহিমে
আমি যাই পোড়াদহ স্টেশন
আর ঠিক তক্ষুনি লুট হয় একশো পূর্ণিমা

এখন সফেদাকাল -
সফেদার ঘ্রাণ মেখে তোমার দুচোখে রাখি নীলহরিণ
এখানে উন্মুখ বকুলবাতাস
এখানে পাহাড়ী পথের আদিমবাসনা
এখানে ছড়িয়ে পলাশের উন্মাদনা
এক আদিবাসী নারী
দিগন্ত বরাবর ছড়িয়ে রেখেছে গাঢ়ঘুমের বাসনা,
তুমুল হাহাকার।
সেই হাহাকারে কাঁদে পিাপসার্ত বন
পিপাসার্ত রাত
পিপাসার্ত দিন
পিপাসার্ত বন্দীশালা
পিপাসার্ত নর ও নারী।

পিপাসার্ত মদের পেয়ালায় ছলকে ওঠে
আদিবাসনার  মতো গাঢ়ঘুম
অন্ধকারে দূর থেকে ভেসে আসে
গারোপাহাড়ের ধুমুল বাঁশী
হে প্রিয়তম যখন তোমার মানবী
 অন্ধকার মেখে ছুটে আসবে পথ ভুলে
তখন পথের সম্মুখে নিদারুন আগুন
ঘর ও ঘোরের বিপত্তি ভীষণ।

এখন পিছনে আমার পোড়াদহকাল
লুট হওয়া মহুয়ার সর্বনাস
আলোর ঘূর্ণিতে মুদ্রিত হয়, একশো চাঁদের কান্না
আলোর ঘূর্ণিতে হেসে উঠে সফেদাবাগান
হেসে উঠে আরেকটা সাইরেন, তোমার হাসির মতোন
হেসে উঠে আমার মন, পোড়াদহ স্টেশন
পিছনে আমার অন্ধকার রাত,তুমুল হাহাকার -।


রাতের বেহালা
           

আমি যেন এক রাতের বেহালা
   কিছুটা সময় নিশ্চুপ হলে হাওয়ার গুঞ্জনে
        ফিরে আসি নিজের কাছে
    নিজের ভিতরে নিজেকে খুলে পড়ে দেখি
          কতটা অপাঠ্য আমি।
   কী ভীষণ অন্ধকার আর এক অসম সত্যের ভেদ
          বিষাক্ত করেছে আমায়।
  আলিঙ্গনের ছায়া ভেদ করে চলে যায় বহুদূরে
  আর দেখি অজস্র জ্যোৎস্না ও হাওয়ার মাতামাতি
  আমি শুনি অশ্রুনিনাদ,আলোর বিমর্ষধ্বনি
  আমার সুর ও স্বর, অশ্রু ও নিনাদ
   দশ খণ্ডে বিভাজিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে
      একোন মোহন মায়ায়?
  আমার দিনের পরিভ্রমণ আর গোপনমোহ
  আমাকে তাড়িত করে নিঃসঙ্গ করে 
     রাতের বেহালার মতো
 আর আমি শুনতে থাকি উত্তরের হাওয়ায়
      ভেসে আসা অরফিউসের গান।



চোখের উপকথা


তিন সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এসেছিল চিঠি
চিঠিতে প্রশ্ন করা হয়েছে
“তোমার চাখের রং কি নীল -না ধূসর!”
কথিত আছে,
 নীলচোখের মেয়েরা দৃঢ়প্রত্যয়ী এবং প্রেমিকের 
প্রতি বিশ্বস্ত
ধূসরচোখের মেয়ে চঞ্চল আর রাত্রির মতোন
বিষণ্ণ খুউব
দূর নদীর মতোন
পত্র পাঠমাত্রই কঠিন অসুখে ভুগেছি ছ’মাস
রোগে ভুগে ভুগে চোখের রং হয়েছে
দিঘির জলের মতোন
ততদিনে আমি জেনে গেছি পৃথিবীর সব ইতিহাস
জলের গল্প হাওয়ার গান
চন্দ্র সূর্য নক্ষত্রের উৎপত্তি ও অবস্থান
জেনেছি নিষিদ্ধরাতের সারগাম
নিজের কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরপাক খাই ক্রমাগত

আরো তিন মাস পর প্রতিত্তোরে লিখলাম
আমার চোখের রং অরণ্যের মতোন ঘনসবুজ
যেখানে মহুর্মুহ আছড়ে পড়ে সমুদ্র
আবার কখনো বৃষ্টির ফোটার মতোন সাদা
আর আগুনের প্রতি ভীষন আস্থাশীল
 ছত্রিশ বছর হলো সেই চিঠি আজও সমুদ্র ভ্রমণ করছে
নিরুদ্দিষ্ট সেই নাবিকের খোঁজে 



আত্মহননের কবিতা    
                          
প্রতিটি নদী প্রতিটি ঢেউ
প্রতিটি ভোর প্রতিটি সন্ধ্যা
হাওয়ায় হাওয়ায় তোলে গুঞ্জন।
প্রতিটি তারা প্রতিটি সম্পর্ক
পরস্পর থেকে যাচ্ছে সরে দূরে
চাঁদ ক্রমে ক্রমে হচ্ছে যুবতী প্রতিদিন।
শুধু আমি আর একটা
আত্মহননের কবিতা
কি করে যেন জেগে থাকি
অনাদিকালের অন্ধকারে
আলোর পরিক্রমা ভেদ করে
চারপাশের হুলুস্থুল স্তব্ধতা
মিশে যায় অন্ধকারে  আমি চিৎকার করি।
আমার চিৎকারে জেগে ওঠে
একটা মৃত হরিণী
ঘোষণা করে কবির নাম
আমি নিজেকে প্রস্তুত করি
যদিও আমি এখন পর্যন্ত
আত্মহননের একটিও কবিতা লিখিনি
লিখতে চাই না অথচ আমি দেখি
অন্ধকারে আমার উঠোনে
ঠাসাঠাসা আঙ্গুরের থোকায়
ঝুলে আছে অসংখ্য মৃত হরিণের চোখ
আর বেহেস্তের বাগান থেকে
শিস দিলে এক অলীকস্বর
অমনি  আমার বুকে ফেটে পড়ে
টসটসে ডালিমদানা।


পৃথিবী ও আমার মৃত্যু সংবাদ
        

প্রস্থানের আয়োজন সুস্মপন্ন 
মহাকালের ভেতর ঘুমেিয় যাব এখন
সম্মুখে পথের গহন পথিকের মায়া
তবু ফিরবনা আর কোনদিন।
এই পথেই
 নিজেকে হারিয়েছি বহুবার
সবুজের উত্তাপে, চায়ের সুঘ্রানে,
নির্জন মাঠে হারিয়ে যাওয়া সেই পাঁচ সংখ্যার কুহুক
ফিরে পাবনা  কোনদিন
আর কোনদিন যাবনা সম্মিলিত শোকের মিছিলে।

ভালোবাসা এখন পরীক্ষিত সত্য
বিশুদ্ধ মদ্যপান
কিছুটা ব্যবধান
কিছুটা দূরত্ব
বিশুদ্ধ লোবানে
 অশ্রুনিনাদে
মত্ত আলোর 
কিশোরীরাত
অন্ধকার ছায়ার মতোন
পরাজয়ের মাহাত্যে
 গোপন থাক
নিজস্ব প্রতিবেদন।

সংবাদ শিরোনামে ছাপানো হবে কি
 আমার মৃত্যু সংবাদ?

হে মহাকালের পৃথিবী নিরুত্তর থেকোনা আর



অলংকরণঃ তাইফ আদনান